৩ বৈশাখ, ১৪৩৩
১৭ এপ্রিল, ২০২৬

ইরান যুদ্ধ ‘শেষের দিকে’, বাড়ছে ‘চুক্তির আশা’

Admin Published: April 16, 2026, 6:08 pm
ইরান যুদ্ধ ‘শেষের দিকে’, বাড়ছে ‘চুক্তির আশা’

ডিএনএন ডেস্ক: ইরান যুদ্ধ শেষের দিকে এগোচ্ছে বলে আশাবাদ বাড়ছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ‘জটিল বিষয়গুলোতে’ অগ্রগতি অর্জন করেছেন।পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আশা করছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় একটি বড় অগ্রগতি আসতে পারে। এই আশাবাদের খবরটি এমন এক সময় এসেছে যখন সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করছিলেন।


তবে ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।


পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বুধবার তেহরানে পৌঁছান।


একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানান, এই সফরের ফলে দ্বিতীয় দফা আলোচনার আশা এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা বেড়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক কথা বলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তি হলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে খুলে যাবে।


পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, উভয় পক্ষ আলোচনায় ফিরতে রাজি হয়েছে, তবে এখনো কোনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি।


‘ইরান যুদ্ধ শেষের খুব কাছাকাছি’


কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে ট্রাম্পের আশাবাদী মন্তব্যে। তিনি মঙ্গলবার বলেন, বিশ্বকে অসাধারণ দুই দিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং ইরান যুদ্ধ শেষের খুব কাছাকাছি।


হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি লেভিট বলেন, পরবর্তী আলোচনা সম্ভবত ইসলামাবাদে হবে এবং পাকিস্তান-মধ্যস্থ আলোচনা গঠনমূলক ও চলমান।


তিনি বলেন, তারা একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।


এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, ইসলামাবাদে আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে কয়েকটি বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে এবং সেগুলোতে ইরানের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।


যুদ্ধ বন্ধে লেবাননে শান্তি জরুরি


পাকিস্তান জানিয়েছে, বর্তমানে কার্যকর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শান্তি আলোচনার জন্য লেবাননে শান্তি অপরিহার্য।


একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা বুধবার লেবাননে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেছে। একইসঙ্গে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, দুই দেশের নেতারা বহু দশক পর প্রথমবারের মতো কথা বলবেন।


বুধবার মধ্যরাতের আগে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, দুই নেতা (ইসরায়েল ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট) শেষবার কথা বলেছিলেন প্রায় ৩৪ বছর আগে। এটি আগামীকাল ঘটবে। চমৎকার!


লেবাননের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চলছে বলে তারা অবহিত হয়েছেন, তবে এর সময়কাল বা ঘোষণার সময় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই।


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এর সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য গিলা গামলিয়েল।


শেয়ারবাজারে উর্ধ্বগতি


যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার প্রত্যাশায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শেয়ারবাজারে জোরালো উত্থান দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার লেনদেনে বৈশ্বিক শেয়ার সূচক নতুন সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। ওয়াল স্ট্রিটেও বুধবার রেকর্ড উচ্চতা স্পর্শ করে, কারণ তেলের দাম স্থিতিশীল হয়েছে।


পারমাণবিক ইস্যু বড় বাধা


ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি বলেন, আলোচনায় সফল হতে হলে ইরানের অধিকার, স্বার্থ ও মর্যাদা স্বীকার করতে হবে।


তিনি বলেন, কিন্তু যদি এটি আগের মতোই প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও শর্ত না মানার ওপর নির্ভর করে, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই সফল হতে পারে না।


গত সপ্তাহান্তের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল প্রধান জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়—যা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পুরোনো দাবির তুলনায় কিছুটা শিথিল। অন্যদিকে তেহরান ৩ থেকে ৫ বছরের বিরতির প্রস্তাব দেয়।


ওয়াশিংটন চায়, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। অন্যদিকে তেহরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।


দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অর্ধেক পার হওয়ার পরও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো সমাধান হয়নি বলে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।


আরেকটি সূত্র জানায়, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ও যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা করতে রাজি হয়েছে।


ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ


যুদ্ধের ফলে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্যদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় রপ্তানি কমে গেছে।


যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে ইরানি বন্দরে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ জোরদার করেছে।


ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ চালিয়ে গেলে তারা উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্য বন্ধ করে দেবে।


একটি সূত্র জানায়, চুক্তি হলে সংঘাত পুনরায় শুরু ঠেকাতে ইরান ওমান অংশ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে পারে।


উত্তেজনা এখনও রয়ে গেছে


আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ এখনো হরমুজ প্রণালীতে কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বুধবার পর্যন্ত তারা ৯টি জাহাজ ফেরত পাঠিয়েছে।


ইরানের সামরিক বাহিনী এই অবরোধকে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।


ইরানের ফার্স নিউজ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি সুপারট্যাঙ্কার অবরোধ অতিক্রম করেছে, যদিও বিস্তারিত দেয়নি।


ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের কমান্ডার আলি আবদুল্লাহি সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তুললে তারা আঞ্চলিক বাণিজ্য বন্ধ করে দেবে। তিনি বলেন, ইরান লোহিত সাগর, উপসাগর ও ওমান সাগরে বাণিজ্য আটকে প্রতিশোধ নেবে।


সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা